কুরআনুল কারীমের ভাষা হচ্ছে খাঁটি ও বিশুদ্ধ আরবি ভাষা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَهٰذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ “আর এটি সুস্পষ্ট আরবি ভাষা।” অর্থাৎ, এই কুরআনের ভাষা হলো আরবি—যা অনন্য বাকরীতি, অনুপম অলংকার ও উচ্চ সাহিত্যগুণসম্পন্ন। রাজকীয় বহুবচন: আরবি ভাষার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রাজকীয় বহুবচন আরবি ভাষার একটি সুপরিচিত ও অলংকারময় বৈশিষ্ট্য। উদাহরণস্বরূপ, সালাম দেওয়ার সময় কোনো একজন ব্যক্তিকে আমরা (বহুবচনে) বলি—
“আসসালামু আলাইকুম”
যার শুদ্ধ অর্থ: “আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক”। এখানে ‘আলাইকা’-এর পরিবর্তে ‘আলাইকুম’ ব্যবহার করা হয় সম্মান প্রকাশের জন্য—সংখ্যাগত বহুবচন বোঝানোর জন্য নয়। কুরআনে আল্লাহর বক্তব্যে রাজকীয় বহুবচন
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা কুরআন মাজিদে তাঁর রুবুবিয়্যাতের (প্রভুত্বের) বর্ণনার ক্ষেত্রে অধিকাংশ আয়াতে সম্মানজনক রাজকীয় বহুবচন ব্যবহার করেছেন। যেমন—
﴿إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا﴾ “আমরা আপনাকে একটি সুস্পষ্ট বিজয় দিয়েছি।”
অন্যদিকে, উলুহিয়্যাতের (ইবাদতের) এবং আসমা উস-সিফাতের (নাম ও গুণাবলি) ক্ষেত্রে তিনি একবচন ব্যবহার করেছেন। যেমন— ﴿وَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَّاحِدٌ لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمٰنُ الرَّحِيْمُ﴾
কেন দ্বিবচন ব্যবহার হয়নি?
আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষেত্রে কখনো দ্বিবচন ব্যবহার করেননি। কারণ—
• দ্বিবচন কেবল সীমিত সংখ্যা নির্দেশ করে
• আল্লাহ তাআলা সীমা ও সংখ্যার ঊর্ধ্বে
• তিনি এ ধরনের সীমাবদ্ধতা থেকে পূতপবিত্র
এ ছাড়া, আল্লাহ তাআলার বহু গুণবাচক নাম রয়েছে, এবং বহুবচন সর্বনাম তাঁর এসব গুণের সামগ্রিক মহিমাকেও নির্দেশ করতে পারে।
অনুবাদে কোন রীতি অনুসরণ করা শ্রেয়?
কাজেই, কুরআন মাজিদের বাংলা অনুবাদে আল্লাহ যেভাবে নিজেকে উল্লেখ করেছেন, সেভাবেই অনুবাদ করা শ্রেয়।
• যেখানে আল্লাহ একবচনে বলেছেন “আমি” → সেখানে আমি
• যেখানে তিনি রাজকীয় বহুবচনে বলেছেন “আমরা” → সেখানে আমরা
এখানে ‘আমরা’ শব্দটি সংখ্যাগত বহুত্ব বোঝাতে নয়, বরং আল্লাহর মহত্ব ও গৌরব প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত।
অন্যান্য অনুবাদে রাজকীয় বহুবচনের ব্যবহার
আরবি বাকরীতি অনুসরণ করে বাংলাভাষীদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে “মহিমান্বিত কুরআন – মর্মার্থ ও শাব্দিক অনুবাদ”-এ রাজকীয় বহুবচনগুলো বহুবচন হিসেবেই অনুবাদ করা হয়েছে।
এটি নতুন কিছু নয়। ইংরেজি ও বাংলা বহু অনুবাদেও এই রীতি অনুসৃত হয়েছে। যেমন—
• The Noble Qur’an
(Muhammad Muhsin Khan & Muhammad Taqi-ud-Din al-Hilali)
• The Clear Quran
(Dr. Mustafa Khattab)
• Saheeh International
• তাফসিরে আবু বকর যাকারিয়া
লেখক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
প্রকাশনী: তাওহীদ পাবলিকেশন্স
আলেমদের বক্তব্য
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) তাঁর গ্রন্থ আল-আকীদাহ আত-তাম্মুরিয়্যাহ-এ বলেন—
“(إِنَّا) ও (نَحْنُ) জাতীয় বহুবচনের শব্দ কখনো কোনো ব্যক্তি তাঁর দলের পক্ষ থেকে ব্যবহার করেন, আবার কখনো একজন মহান ব্যক্তি—রাজা বা শাসক—নিজের বক্তব্যে ব্যবহার করেন। যেমন, তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করলে বলেন: ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি’। অথচ তিনি একজনই। এটি ভাষাগত শিষ্টাচার ও সম্মানের প্রকাশ।”
আর সকলের চেয়ে অধিক সম্মান ও মহিমার অধিকারী সত্তা হলেন সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তাআলা। অতএব, এই বহুবচন প্রশংসার জন্য, একাধিক বোঝানোর জন্য নয়।
আল্লাহর একত্বের সুস্পষ্ট ঘোষণা
মহান আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়; তাঁর কোনো শরীক নেই। কুরআনে তিনি বলেন—
﴿قُلْ هُوَ اللّٰهُ أَحَدٌ﴾
﴿وَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَّاحِدٌ لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمٰنُ الرَّحِيْمُ﴾
উপসংহার
অনেকে মনে করতে পারেন—আমরা তো বাংলাভাষী, আরবি বুঝি না; তাই আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘আমরা’ ব্যবহার করলে বিভ্রান্তি হতে পারে, মানুষ শিরকে পতিত হতে পারে ইত্যাদি।
তাদের এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলতে চাই—
আরবি ভাষা ও কুরআনে ব্যবহৃত সম্মানজনক রাজকীয় বহুবচন—যা আল্লাহর মহত্ব ও গৌরব প্রকাশের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ভাষাগত রীতি—এই বিষয়টি বাংলাভাষী মানুষের কাছে আর কতদিন অজানা রেখে দেওয়া হবে?
এটা কি আদৌ যুক্তিসংগত?
বরং, আরবি ভাষা ও কুরআনে ব্যবহৃত *সম্মানজনক রাজকীয় বহুবচন* আল্লাহর মহত্ব ও গৌরব প্রকাশের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রীতি। এটি গোপন করা নয়; বরং বাংলাভাষী পাঠকের কাছে *স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত*।
এটাই কুরআনের ভাষা, এটাই তার সৌন্দর্য।
আরও দেখুন: